Bangladesh Students' Association in Turkey BASAT

যা জানার ছিল জেনেছি, যা দেখার ছিল দেখেছি

ভ্রমণ কে না ভালোবাসে! ছোটবেলায় ইবরাহীম খাঁয়ের ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র ভ্রমণ কাহিনী পড়ে শত শত বছর ধরে ইসলামি ভাবধারায় প্রায় পুরো আরব জগৎ কে শাসনের ইতিহাস সমৃদ্ধ, ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যকার প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত, অতীতের বাইজেন্টাইন এবং অটোমান সাম্রাজ্যের স্মৃতিবিজড়িত– তুরস্ক দেশটিতে ভ্রমণের প্রবল ইচ্ছা ছিলো। মনের কল্পনার তুলিতে আঁকা মায়াবী সৌন্দর্যমন্ডিত ও সমুদ্র সৈকত এবং পাহাড়ের সৌন্দর্যে স্নাত দেশ তুর্কী ভ্রমণের আকর্ষণ থেকে নিজেকে যেনো মুক্ত করতে পারতেছিলাম না। অবশেষে,  আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর কৃপায় ২০১৭ সালে তুর্কী সরকারের পূর্ণ বৃত্তিতে আগমন ঘটে পৃথিবী শাসিত উসমানীয় খেলাফতের এই দেশটিতে। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে তুর্কীর বিভিন্ন শহরের পথে পান্তরে ঘুরতে ঘুরতে ইতিহাস, চিত্তাকর্ষক স্থাপত্য, ঐতিহাসিক দৃশ্যাবলী সমৃদ্ধ এই দেশটির প্রেমে পড়ে যাই। তাই ধীরে ধীরে তুরস্কের প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভ্রমণের ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠে। নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ককেশীয় অঞ্চলের দুটি দেশ আজারবাইজান ও জর্জিয়ার ভিসা হাতে পাই।

অজানাকে জানার অভিপ্রায় নিয়ে ক্ষণজন্মা মানুষের প্রয়াস অব্যাহত। তাইতো ছোট্ট জীবনের স্বল্প সময় ককেশাস অঞ্চলের দুটি দেশ জর্জিয়া ও আজারবাইজান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার মনোভাব করছি। আশা করছি, জর্জিয়া ও আজারবাইজানের রেখে আসা স্মৃতিচারণ আলোর সামনে উপস্থাপনা আপনাদের ভালো লাগবে। 

তুরস্কের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম যাত্রা জর্জিয়া হওয়ায় মনের ভিতর এক প্রকার অধিরতা কাজ করছিল। আল্লাহর প্রশংসা কি, যথাসময়ে ইস্তাম্বুল সাবিহা গোকছেন বিমানবন্দর থেকে তিবলিস বিমানবন্দরে অবতরণ করি। আকাশপথ থেকেই কল্পনার জর্জিয়া দেশটির সাথে মিল খুজতে শুরু করলাম। সত্যি সত্যি মেঘের আনাগোনা ও লুকোচুরিরর মধ্যে কল্পনার সাথে বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটতে শুরু করে। প্রথমে অভিবাসন বিভাগ আমাদের উপমহাদেশ থেকে আসা লোকজনকে পৃথক করে ফেলায় হতাশ হই। যাচাই-বাছাইয়ের পর অভিবাসন বিভাগ পার হওয়ার সময় মদের বোতলের প্রস্তাবে একটু চমকিত হই। পরে বুঝতে পেরেছি যে, পানির দামে মদ পাওয়া যায় এই দেশটিতে। যেখানে পাঁচশতাধিক বিভিন্ন মদ ও আঙ্গুর উৎপন্ন হয়। মুদ্রা বিনিময় করে মেট্রো কার্ড দিয়ে শীতল আবহাওয়ার মাঝে মৃদু বাতাসে আলোকিত রাজধানী শহরের দিকে রওয়ানা হই। কোলাহল শূন্য শহরে গুগলের সাহায্যে সংরক্ষণ করা পান্থাবাস (Hostel) পৌঁছাই। রাত গভীর হওয়ায় ভ্রমণের জন্য শীর্ষ দশ স্থান নির্বাচন করে ঘুমিয়ে যাই।

টিবলিসের স্বাধীনতাস্তম্ভ

পরদিন সকালে সূর্য উঠার পর পরেই ভারতীয় বন্ধুর সাথে পায়ে হেঁটে পুরাতন শহর দর্শনে যাই; যেখানে জর্জিয়ার স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভসমূহ রয়েছে। স্বাধীনতার স্তম্ভগুলো যুগ যুগ ধরে রাশিয়ার ও আর্মেনীয়ের সাথে শত বছরের যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছে। কিছু সময় পর সাথেই অবস্থিত জর্জিয়ার সংসদ ভবন ও জাতীয় বিদ্যান পরিদর্শনে যাই। ধীরে ধীরে এই শহরে মানুষের কোলাহল ও কর্মচাঞ্চল্য বাড়তে থাকে। ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যবর্তী সীমানায় অবস্থান করায় এ অঞ্চলের গুরুত্ব বেশি। অন্যদিকে বলতে গেলে, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রায় ইউরোপীয়দের মত। প্রথমেই আমরা টিবলিসের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত খুরা নদী পরিদর্শনে যাই। যাহা পৃথিবীর ভ্রমণ প্রেমিক মানুষের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। একদিকে নীল উপত্যকা বেষ্ঠিত পাহাড়ের হাতছানি, অন্যদিকে মাঝে মাঝে শীতল ঝড়ো বাতাসে মায়াবী মোহে ক্ষণে ক্ষণে মনকে প্রশান্তিতে ভরে দেয়। সূর্যের তাপ থাকলেও যেনো তার কাছে অসহায়। পরক্ষণে খুরা নদী বেয়ে শান্তি সেতু পরিদর্শনে যাই। যেটা কিনা শহরকে একপাশের সাথে অন্য পাশের সংযোগ স্থাপন করেছে। উভয় দিক থেকে নদী ও শহর কে সামনে কিংবা পিছনে রেখে ছবি ছিত্রায়নে হয়তো কেউ ভুলবেনা।

নয়নাভিরাম শান্তি সেতু

দুপুর গড়িয়ে আসায় তিবলিসের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে শহরকে দর্শনের জন্য ক্যাবল কারে করে সর্বোচ্ছ বিন্দুতে পৌছায়। যাহা আমাকে অভিনব কায়দায় শহরকে এক পলকে দর্শন ও পাহাড় ঘেরা নীলাভূমিময় স্থানগুলো দেখতে মুগ্ধ করেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল আসার আগেই তিবলিসের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে সরাসরি সাথেই অবস্থিত উদ্ভিদ উদ্যানে যাই–যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ তিবলিসকে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করি। যেখানের নয়নাভিরাম দৃশ্য আপনাকে আমাকে সহজেই বিমোহিত করবে। ঐখানেই ক্লান্তির চাপ প্রশোমনে খানিক্ষণ বিশ্রাম নেই। দৃশ্য অবলোকনে ফেলুদার গল্পের কাল্পনিক স্বপ্নপুরীর রাজ্যের কথা মনো পড়ে যাবে। উদ্যানে আনন্দ পাওয়ার নিমিত্তে কিছু ছবি ছিত্রায়নে নিঃসন্দেহে আপনাকে উৎসাহিত করবে। 

বিকাল গড়িয়ে আসার পূর্বে তুরস্ক বসিকালয় (Restaurant) খুঁজে বের করে মধ্যাহ্নভোজ সেরে ফেলি। বিকালে কয়েকটি গির্জা পরিদর্শন শেষে শীতল আবহাওয়ায় রিজে উদ্যান ও পুনরায় খুরা নদী পরিদর্শনে যাই। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গির্জা গুলো মূলত দুভাগে বিভক্ত। অর্থোডোক্স এবং পোটেস্টন। যেগুলা শত বছর ধরে জর্জিয়ার ধর্মীয় বিশ্বাসের বিভক্তির ইতিহাস ধরে রেখেছে। রিজে উদ্যান ও খুরা নদী পাশাপাশি হওয়ায় প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বাতাসের মৃদুতর  শীতল বেগ মনকে সাময়িকের জন্য প্রশান্তি দিবে। সাথে অবস্থিত পানির ঝর্ণা যেনো মেঘের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসা সূর্য রশ্মির প্রতিফলনের সাথে নীলকর খুরা নদীর জলরাশিতে নানা বৈচিএ্যপূর্ণ রংয়ের সমারোহ করে তোলেছে।

জর্জিয়ার সামেবা গির্জা চত্ত্বর

ঐখানে সন্ধ্যা নিয়ে আসায় রাতের টিবলিসকে দেখার জন্য পুনরায় পুরাতন শহরের দিকে যাত্রা করি। যাত্রাপথে ঐখানে কিছু বাংলাদেশী ভাইদের সাথে পরিচয় হয়। পাশাপাশি তাঁদের জীবনের গল্প শোনা হয়। পরে অনেক কষ্ট করে তিবলিসে অবস্থিত একমাত্র তুর্কি নিয়ন্ত্রিত মসজিদটি খুঁজে পাই। চোট্র এই শহরটিতে এত রকমারি সুন্দর সুন্দর আকৃতির পাহাড় রয়েছে, যাহা অবলীলাক্রমে শহরটিকে আকর্ষণীয় করে রেখেছে। দিনের আলোতে ভূগর্ভস্থ পথ ও আধুনিক অট্টালিকাগুলোর সাথে শিল্পকর্ম খচিত স্মৃতিশৌধগুলো নিয়ে তিবলিসকে কর্মব্যস্ত ও প্রাণবন্ত এক নগরী করে তুলেছে। আর রাতের বেলায়, খুরা নদী থেকে বেয়ে আসা হিমেল হাওয়া ও মৃদু বাতাসে বহমান শীতল করা অনুভূতি অবকাশ উদযাপনকারীদের জন্য জনপ্রিয় স্থান হয়ে উঠেছে।

একসময়ে জর্জিয়া, আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া অভিন্ন ভূখণ্ড ছিলাম। টিবলিস শহরজুড়ে অনেক গুলো আর্মেনিয় গির্জা তাদের প্রভাবই ইঙ্গিত করে। মানুষের চলাফেরা, আচার-আচরণ ইউরোপীয়দের মত সরল ও স্বাভাবিক। শহরটিতে চোখে পড়ার মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিদ্যমান। যার কারণে বিশ্বের ষষ্ঠতম সুরক্ষিত দেশ হিসেবে মনে করা হয়। রাতের কিছু সময় ভারতীয় ও আমেরিকান বন্ধুর সাথে গল্পে আড্ডায় কেটে গেল। পরদিন সকালে স্বল্প সময়ের প্রেমে মুগ্ধ হওয়া জর্জিয়াকে একরাশ বিরহ বেদনা নিয়ে বিদায় জানাতে হল। এখন বলব আজারবাইজান ভ্রমণের গল্প।

পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয় না আমি, থেমে যাব তখনি, যখনি মুখ ফেরাবে তুমি। শুরুতেই সফল এবং সুন্দর জর্জিয়া ভ্রমণের জন্য আলহামদুলিল্লাহ। যথারীতি জর্জিয়ার বহিঃগমন বিভাগ পার হয়ে বিমানে গিয়ে বসলাম।  দূর্ভাগ্যজনকভাবে এক জর্জিয়ান মেয়ের ছেলেবন্ধুর জন্য আমাদের প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। যাহা ছিল খুবই বিরক্তিকর। অবশেষে  কর্তৃপক্ষ তাকে বুঝিয়ে আল্লাহর নামে হযরত উমর (রাঃ) এর সময়ে মুসলিম শাসনে অন্তর্ভূক্তি হওয়া আজারবাইজানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সময়মত আলহামদুলিল্লাহ বাকু বিমানবন্দরে আসলাম। বিমান ঠিক নামার মুহূর্তে বাকু শহরকে জানালা দিয়ে অবলোকন করলাম। নীচে কাস্পিয়ানের তীর, সমুদ্রে জাহাজ, উপত্যকা বেষ্ঠিত বাড়িগুলো আর নীল আকাশ, কি এক চমৎকার দৃশ্য। নেই ট্রাফিক জ্যাম। 

আকাশপথ থেকে বাকু শহর

তুর্কীতে অবস্থানরত আজারবাইজান বন্ধু থেকে আগেই রাজধানী শহরে যাওয়ার সহজ পন্থা জেনে নেই। যথারীতি মুদ্রা বিনিময় করে বিমানবন্দর বাস সেবা ব্যবহার করে আবসেরোন উপদ্বীপে কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম উপকূলে মহাবীর আলেকজান্ডারের স্মৃতিবিজড়িত এবং হিটলারের দখল করার মনোবাসনা থাকা তেলের খনি সমৃদ্ধ রাজধানী বাকু শহরে পৌছায়। পথিমধ্যে ইস্তাম্বুলে বসবাসরত এক আজারবাইজানীর সাথে পরিচয় হয়। তিনি ভ্রমনের  জন্য নানাবিধ পরামর্শ দিলেন। শহরে আসলাম, কিছুক্ষণ হাটলাম। হঠাৎ কাস্পিয়ান সাগর থেকে আসা মৃদু বাতাসে শরীর মন দুটোকেই শিহরিত করে দেয়। ফেলুদার গল্পের সোনার কেল্লার মতো ইচেরীশেহির পাতাল রেলস্টেশন দিয়ে দশমিনিট দূরত্বে আমার পূর্বনির্ধারিত আবাসস্থলে পৌছায়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে খাবার খেতে বের হই। যেহেতু এদের ভাষা আর তার্কিশ ভাষা একই সেহেতু খাওয়া দাওয়া আর কেনাকাটায় কোন বেগ পেতে হয়নি।

কৃত্রিম ভেনিস শহর

তখন বিকাল প্রায় পাঁচটা, বিকালের পড়ন্ত রোদ আর অদূরের কাস্পিয়ান সাগর থেকে চুটে আসা দামাল হাওয়া শহরের বাসাগুলোর দেয়ালে পড়ে ধাতব মুদ্রার মতো ঝিকমিক করে উঠে। উদ্দেশ্যহীন শহরটাকে ঘুরতে বের হলাম। প্রথমেই কাস্পিয়ানের তীরে, যেখানে অনেক তেলের খনি আছে। রাজধানী বাকুকে পৃথিবীর তেলের আতুঁড় ঘর বলা হয়। পরিশ্রান্ত মনকে শান্ত করে ফিরলাম শহরের বহুল জনসমাগম বেষ্ঠীত বিখ্যাত নিজামি সড়কে। সন্ধায় ঝিকিমিকি আলোতে নিজামী সড়ক কে এক অপরুপ সৌন্দর্যে রূপায়িত করেছে। যাকে আমরা তুর্কীর ইস্তেকলাল সড়ক বলতে পারি। যেখানে আপনি ছবি চিত্রায়ন করে আজীবন ধরে রাখতে চাইবেন। বাকুতে অবস্থানরত তুর্কী বন্ধুর ছোট ভাইযের সাথে যোগাযোগ হয়। পরে একসাথে তুর্কী রেস্তোরা থেকে রাতের খাবার শেষে আগামীদিনের পরিকল্পনা করে বিশ্রামে যাই, বেশী দেরী না করে ঘুমিয়ে পড়ি।

পরদিন সকালে পরিকল্পনা মাফিক বাকু শহর ভ্রমণে বের হই। নিজামী রাস্তা হয়ে চতুষ্কোণ ফোয়ারার দিকে যাওয়ার পথে হাতের বামদিকে রাশীয় অপেরা ও থিয়েটার হল রয়েছে, যা কিনা মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত। বাকুতে রয়েছে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য। এখানেই প্রথম মুসলিম বিশ্বে গ্রন্থাগার খোলা, প্রথম অপেরা মঞ্চস্থ, এবং প্রথম থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। বন্ধুর সাথে সর্বপ্রথম ইচেরী শেহীর দেয়াল ও ঘর নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনে যাই। ইচেরী শেহীরে প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রয়েছে, যেটা কিনা স্থানীয় এবং ভ্রমনপিয়াসুদের জন্য এক দর্শনীয় স্থান। এখানকার রেস্তোরাগুলোতে আজারবাইজানের মজার মজার খাবার পাওয়া যায়। মজার বিষয় হচ্ছে এখানে অনেক ভ্রমণ তথ্যবিভাগ রয়েছে। পাঁচ ভাষায় ভ্রমণের ছোট যন্ত্র রয়েছে যা দিয়ে খুব সহজে ইচেরী শেহীর কে অবলোকন করতে পারবেন। ছোট ছোট দোকানগুলোতে রাখা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নিঃসন্দেহে মনোযোগ কাড়বে। যাকে  ২০০০ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে মর্যাদা দেয়। যেখানে আরো অনেক ঐতিহাসিক মিনার, পাথরের দূর্গ, প্রাসাদ ও মসজিদ রয়েছে। ইচেরী শেহীরে ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে যায়। তারপর কাছেই অবস্থিত মেইডেন টাওয়ার ও শিবনি শাহ প্রাসাদ পরিদর্শনে যাই, যা কিনা ১২তম শতাব্দীতে তৈরি এবং ২০০১ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত। এগুলো মূলত জাদুঘর, যেখানে বাকু শহরের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে উপস্থাপন করছে।

বিখ্যাত নিজামী সড়ক

বিকেল ঘনিয়ে আসায় একসাথে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে বন্ধুকে ঐ দিনের জন্য বিদায় দেই। তারপর আজারবাইজান জাতীয় কার্পেট জাদুঘর— বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্পেট সংগ্রাহক— দর্শনে যাই। যেখানে কার্পেট দিয়ে তৈরী হরেক রকম জিনিসপত্র দেখা যায়, ফুল থেকে শুরু করে পশু পাখির ছবি পর্যন্ত অংকিত রয়েছে। উল্লেখ্য আজারবাইজানের জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে কোরআনের ক্ষুদ্রতম পান্ডূলিপি। এর পরপরই পাশে অবস্থিত ইতালির ভেনিস শহরের আদলে সাজানো কৃত্রিম ক্ষুদ্র ভেনিস পরিদর্শনে যাই। যা আপনাকে আমাকে নিঃসন্দেহে বিমোহিত করবে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হওয়ায় আবাসস্থলে ফিরে আসি।

যেহেতু আধুনিক বাকু এই দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র. সেহেতু আজকের পরিকল্পনায় কিছু সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রেখেছি। শুরুতেই পাতালরেল দিয়ে আলীবেগ কেন্দ্রে যাই। এটার গঠন প্রকৃতি ও স্থাপত্য এত সুন্দর যে বাহির থেকে অতীব চমৎকার লাগে। যেটা কিনা ব্রিটিশ স্থাপত্যশিল্পি দ্বারা নির্মিত। স্বতন্ত্র স্থাপত্য, বাঁকা শৈলীর কারুকার্য ও ভিতরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নির্দিধায় আমাকে আকর্ষণ করেছে। তারপর নিকটেই পনের শতাব্দীর নির্মিত শ্রীবানশাহের প্রাসাদ ভ্রমণে যাই। যেটা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত যাকে আজারবাইজানের স্থাপত্যের মুক্তা বলা হয়। 

সময় গড়িয়ে দুপুর, এবার গন্তব্য ফ্লেমী টাওয়ারে, এখন আমি একাই ঘুরছি, সাথে গুগল। ফ্লেমি টাওয়ারের বিশেষত্ব হলো তার এলইডি স্কিনগুলো সম্পূর্ণরুপে ঢাকা থাকে যাহা শহরের দূরদূরান্ত থেকে আগুনের চলাচলকে নির্দেশ করে। যেটা দেখতে দৈত্য শিখার আজারি রংয়ের মত।  প্রায় দুমিনিট পরপর জলের দৈত্যের শোতে রুপান্তর হয়। যেটা রাতের বাকু শহর কে অনিন্দ বানিয়ে রেখেছে। সময় যে বেগমান, ছুটে চলে অবিরাম। তারপর গন্তব্য সাথেই অবস্থিত, হাইল্যান্ড পার্ক, যেটা কিনা বাকু শহরের একটা উচু জায়গা। দৃশ্যাবলী এত সুন্দর যে, পিছনে বাকু শহর ও কাস্পিয়ান সাগর কে রেখে কার না মন চাইবে ছবি ছিত্রায়ন করতে। প্রায় আধঘন্টা সূর্যের তাপ ও কাস্পিয়ানের প্রবল বাতাস কিছুক্ষণের জন্য মনোজগৎে চিন্তার রাজ্যে ডুবে যায়। অনুভব করি, সষ্টার সৃষ্টির অপরুপ নীলিমা। এর সাথে ঘেষেই অবস্থিত শহীদ স্তম্ভ দেখতে পাই, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৯১ সালের সৌভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধের অনেক আজারী ও তার্কিশ সৈন্যের কবর রয়েছে।

মেইডেন চত্বর, বাকু

দুপুরবেলা গড়িয়ে বিকালবেলা, পথিমধ্যে বাকু বন্ধু আবার যোগ দিলেন। পুনরায় আমরা শহর পরিদর্শনে যাই।  বাকুর পথে পান্তরে হাটতে হাটতে নানান গল্প কথা হয়, জানতে পারি বাকু শহরে কেন এত মসজিদ কম। জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলিম হলেও প্রাত্যহিক জীবনে নেই কোনো ধর্মের ব্যবহার কিংবা কার্যকারিতা। পারস্য, উসমানীয়, আর রাশিয়ান শাসনে এই জাতি নিজস্ব স্বকীয়তা লাভ করতে পারে নি। ইতিহাস তাদেরকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত থেকে আলাদা হলেও আচার আচরণ সংস্কৃতিতে এখনো সোভিয়েত ধারা অব্যাহত। বাকু শহরটি কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম উপকূলে অবস্থান করায় প্রচুর পশ্চিমা বায়ু শহরকে মাঝে মাঝে ঝড়ো বাতাসের শীতল হাওয়ায় ভরে দেয়। বিকাল গড়িয়ে সন্ধা, আমরা আবার চতুষ্কুন ফোয়ারার  পাশে গিয়ে বসি, কিন্তু হঠাৎ মৃদু বাতাসে টিকতে না পেরে আবার বিখ্যাত নিজামী সড়কের দিকে যাই। রাতের বাকু যেনো কাষ্পিয়ানের তীরে গড়ে উঠা একটি মুক্তা। ককেশাসে অনেক শহর রয়েছে কিন্ত এটি বিশেষ এবং অনন্য সৌন্দর্য। রাতে একসাথে খাবার খেয়ে গল্পগুজবে কিছুসময় কাটিয়ে বন্ধুকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় দিলাম। পরেরদিনের বাকুকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমিয়ে যাই। 

ঐতিহাসিক ইচেরীশেহির

স্মরণীয় রাখার মতো বাকু বিমানবন্দর বহিঃগমন বিভাগে কর্তৃপক্ষ ইস্তাম্বুলে ফেরত নিয়ে ব্যাপক শংসয় প্রকাশ করে। কয়েকবার  জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হই। পরিশেষে, আলহামদুলিল্লাহ প্রমাণাদি দিয়ে উদ্ধার হই। 

হঠাৎ হৃদয় আমার ব্যাথীত হলো এক অপূর্ণতায়, ভুবনের এই উজাড় করা প্রেম ছেয়ে গেল ধূসরতায়। ফিরতে হলো ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত জীবনের ভীড়। রেখে আসলাম কাস্পিয়ানের মনোমুগ্ধকর বাকুর নীড়। যা জানার ছিল জেনেছি, যা দেখার ছিল দেখেছি। তাই বিদায়ের বেলায় আজারবাইজানে আমাকে আবারও ভ্রমণে উৎসাহিত করছে। আপনারাও ঘুরে আসতে পারেন কাস্পিয়ান সাগরের তীরে ককেশাস অঞ্চলের এই দেশটিতে।

Share this post

Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

Designed by Alamin Moni

Copyright© BASAT 2019-2020

error: Content is protected !!

লেখক পরিচিতি

সাইয়্যেদ মাগফুর আহমদ

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জেলা লক্ষীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ শহরে মাধ্যমিক শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ঢাকা শহরে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০১৭ সালে তুরস্ক সরকারের পূর্ণ বৃত্তিতে তুরস্কে আগমন করেন। বর্তমানে তিনি ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ইসলামী অর্থনীতি ও অর্থায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত।বৈজ্ঞানিক সাময়িকে ইতোমধ্যে তাঁর দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।লেখালেখী করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গবেষনার কাজে ব্যস্ত থাকায় হয়ে উঠে না, মাঝে মাঝে কিছুটা লেখার চেষ্ঠা করছেন। বর্তমানে বাসাত এর সহশিক্ষা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।