Bangladesh Students' Association in Turkey BASAT

যুদ্ধশিশুরা

আমি আগে যে স্কুলে শিক্ষকতা করতাম সেখানে পিচ্ছিদের ক্লাসে আমার একটা স্টুডেন্ট ছিল। নাম হাসান (ছদ্মনাম)। কিউটের ডিব্বা। কিন্তু দুষ্টের দুষ্টু। নিজে দুষ্টামি করত তাই না। তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গও ছিল। এদের নিয়ে পুরা স্কুল দাপিয়ে বেড়াত। সবসময় ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি, একে খোঁচা মারা, ওকে মার দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তার নামে অনেক বাচ্চার আর অভিভাবকদের নালিশ।

কিন্তু সে পিচ্ছি কেন জানি আমার সাথে অন্যরকম আচরণ করত। খুব শান্ত, ভদ্র। শুধু তাই না অন্যরা দুষ্টামি করলে বা ক্লাসের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সে আমার সাহায্যে ছুটে আসত আর তার নেতৃত্বের গুণাবলি দিয়ে পুরা ক্লাস লাইনে এনে ফেলত। আমিও এজন্য তার সাথে বন্ধুর মত হয়ে গেলাম। তার আসল ঘটনা জানতে লাগলাম আস্তে আস্তে।

সে যে আসলে খুবই নিরীহ, একাকী, আইসোলেটেড, আর দুঃখী একটা ছেলে তা বুঝে গেলাম খুব দ্রুত। তার এই হাইপার এক্টিভ দুষ্টু পারসোনাটা সে তৈরি করেছে স্বেচ্ছায়, যার মাঝে সে তার ভিতরের ভালনারেবল আইডেন্টিটিটাকে হাইড করে রাখে কিংবা গার্ড দেয়।

হাসান হল লিবিয়ান বংশোদ্ভূত। যুদ্ধ আর অরাজক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে সে তার বাবা মা সহ তুরশকে এসেছে এক টুকরো নিরাপদ আর নতুন জীবনের আশায়।

কিন্তু হায়, এখানে সে যে নেইবরহুডে এসেছে সেখানে তারকিশ আল্ট্রা সেকুলার, এন্টাই আরব মানুষ দিয়ে ভরা। এর উপর সে আবার তারকিশ ভাষা পারে না। ছোট থেকেই সে রেসিজম আর জেনোফোবিয়ার স্বাদ আস্বাদন করে ফেলেছে! তার টোটাল ওয়ার্লড ভিউ চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে! এর ধারাবাহিকতায় সে বুদ্ধি খুঁজে পায় এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার। সেটার রেসাল্ট হল তার এই পারসোনালিটি চেঞ্জ। আর আমার সাথে ব্যতিক্রম আচরণ করার কারণ সম্ভবত ছিল যে আমিও তার মত বিদেশি। পুরা স্কুলে একমাত্র ছেলে টিচার আর ফরেন ছিলাম আমি – যে কোনও তুরকিশ ভাষা বলত না। শুধু ইংরেজি । আর বলা বাহুল্য, এই এক দিক থেকে সব ছাত্র থেকে অনেক এগিয়ে ছিল সে।

যা হোক সে স্কুল ছেড়ে অন্য এক জায়গায় জব করছি অনেকদিন হল। কিন্তু আজ যখন লিবিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাত/গৃহযুদ্ধের ব্যাপারে স্টাডি করছিলাম, তখন হঠাৎ হাসানের কথা মনে পড়ে গেল।

এরা যুদ্ধশিশু… এদের শারীরিক, মানসিক প্রটেকশনের দায়িত্ব আমাদের উপরও বর্তায়। যে কোনো কনফ্লিক্ট নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যখন হলিস্টিক চিন্তা করে বড় বড় বিশ্লেষণ করে, এর আড়ালে তখন এসব ছোট শরীরের বড় বড় “কলাটেরাল ডেমেজ” গুলো ঢাকা পড়ে যায়। এদের নিয়ে ভাবনার সময়টুকু আর পাওয়া যায় না।

এই করোনায় যখন আপনি আমি বাসায় কোয়ারান্টাইনে; তখন সিরিয়ান, ইয়েমেনী, লিবিয়ান, আফগান, ইরাকী, রোহিঙ্গা লাখো শিশুর কোনো বাসার ঠিকানাই নেই।আর ঠিকানা থাকলেও নেই মানবিক সম্মান আর মেন্টাল প্রটেকশন। 😞

প্লিজ ভাবুন ওদের কথাও…

রাকিব বিন ওয়ালী

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট ( লিবিয়ার এতিহ্যগত পোশাকে একটি লিবিয়ান শিশু)

Share this post

Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

Designed by Alamin Moni

Copyright© BASAT 2019-2020

error: Content is protected !!

লেখক পরিচিতি

রাকিব বিন ওয়ালী

জন্ম বাংলাদেশের ঢাকায়। শৈশব আর কৈশর কেটেছে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ, গাজীপুর, আর ঢাকার ব্যস্ত শহুরে কোলাহলে।

ঢাকার আইডিয়াল স্কুল (বনশ্রী) থেকে এসএসসি, আর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পরে সুযোগ পেয়েছিলেন নিজ শহরেই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার।  তবে লেখকের সুপ্ত ইচ্ছা ও অজানাকে চেখে দেখার নেশাই জয়ী হয়।
২০১৬ সালে তিনি স্কলারশিপ নিয়ে তুরশকে পাড়ি জমান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে উচ্চশিক্ষার জন্য।লিখতে ভালোবাসেন। জানতে ভালোবাসেন, পড়তে ভালোবাসেন। এবং মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনের গল্পগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পছন্দ করেন।