Bangladesh Students' Association in Turkey BASAT

মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় এবং অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের প্রকোপ

করোনা ভাইরাসের বিস্তার পৃথিবীকে এক অনিশ্চিত সম্ভাবনার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, মানুষের মনে তৈরি করেছে তীব্র  উদ্বেগ।প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রায় পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে লকডাউন,যার ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।করোনার সংক্রমণ নিয়ে এই উদ্বেগ,উৎকন্ঠা মানুষের মনে তৈরি করেছে বাড়তি চাপ,যা আচরণগত পরিবর্তন সৃষ্টি করে।করোনার প্রকটতায় রোগ ও মৃত্যুতে বিপর্যস্ত মানুষ বিচ্ছিন্নতা,দারিদ্র্যতা ও চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে জীবনযাপন করছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মহামারির সময়ে অস্থিরতা,আতঙ্কিত হওয়া সবই স্বাভাবিক।এ সময় মানসিক সুস্থতার জন্য ইতিবাচক থাকা খুবই জরুরী।

প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত মৃত্যুর  খবর,আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি,প্রবাসে থাকা স্বজনের জন্য দুশ্চিন্তা,পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা,সুচিকিৎসার অভিযোগ,সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এসব দেখে আমরা ব্যাকুল হয়ে পড়ছি।প্রচন্ড রোগীর চাপে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নেতিয়ে পড়েছে।এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা বা বিষন্নতা আমাদের শরীর ও মন উভয়ই আচ্ছন্ন করে।মানুষের মাঝে যখন তীব্র মাত্রায় দুশ্চিন্তা,ভয় সৃষ্টি হয় তখন পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রতিকূলতা প্রশমনে   তার মধ্যে এড়িয়ে চলার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। যখন এটি প্রকট হয়ে স্থায়ী লাভ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার  বলা হয়।এর বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে অন্যতম প্যানিক ডিজঅর্ডার(Panic disorder)।এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ পায় শারীরিকভাবে।আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল  অ্যাসোসিয়েশন প্যানিক ডিজঅর্ডারের বেশ কিছু লক্ষণ নির্ধারণ করেছেন।উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোঃ

  • বুক ধড়ফড় করা,হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি
  • মাথাঘোরানো এবং শরীরে ঘাম হওয়া
  • শরীরে কাঁপুনি হওয়া,শ্বাসকষ্টে ভোগা
  • দম বন্ধ হয়ে আসা,বুকে ব্যথা অনুভব করা
  • বমি বমি ভাব,শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তন
  • ডিপার্সোনালাইজেশন অনুভব করা

নারীরা এই রোগে  বেশি আক্রান্ত হয় এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

WHO বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,“শারীরিক বিচ্ছিন্নতা মানুষকে অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে। সংক্রমণের ভয়,প্রিয়জন হারানোর শঙ্কা মানসিক স্বাস্থ্যকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। “

এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের সাথে আমাদের স্ট্রাগল করতে হচ্ছে তা হলো-দীর্ঘক্ষন বাসায় অবস্থান করা।আমরা স্বভাবতই এটির সাথে অভ্যস্ত না কিন্ত এই দূর্যোগকালীন সময়ে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই একটা লম্বা সময় আমরা বাড়িতেই অবস্থান  করছি।এর ফলস্বরূপ নানা দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করেছে।চাকরি হারানোর ভয়ও আমাদের মনে হানা দিয়েছে।অলস সময় পার করতে সকল বয়সের মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছে।এটিকে পুঁজি করে কিছু দুষ্টচক্র মিথ্যা-বানোয়াট,ভিত্তিহীন  খবর ছড়াচ্ছে।সাধারণ মানুষ তা যাচাই-বাছাই না করে বিশ্বাস করছে,আতঙ্কিত হচ্ছে।জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়,”মহামারির কারণে লাখ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক অস্থিরতার শিকার হতে শুরু করেছে, জীবিকা হারানোর ভয়ে তারা ভীত,এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা সংক্রান্ত ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি।” 

অনেকেই আবার এই সময়গুলোতে নির্ঘুম রাত যাপন করছে,দুপুরে ঘুম থেকে উঠছে যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।অর্থনৈতিক,মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অনেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।এর কারণ হিসেবে হলফ করে বলা যায় অনেকেই এখন চাকরিচ্যুত,আর্থিকভাবে খারাপ সময় কাটাচ্ছে।তাছাড়া পরিবারের সদস্যদের ভরনপোষণ,চাহিদা তাদেরকে তাড়িত করছে।যার ফলশ্রুতিতে একপর্যায়ে তারা বাধ্য হচ্ছে।আমাদের সমাজেও করোনা পজিটিভ ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে,দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে,আইসোলেটেড করা হচ্ছে তার পরিবার,প্রিয়জন থেকে।অন্যদিকে মৃত ব্যক্তির দাফন বা সৎকার নিয়ে সামাজিকভাবে বিড়ম্বনা,বৈষম্যমূলক আচরণতো আছেই।তাছাড়া খাবার,নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের চ্যালেঞ্জ মানুষকে আরো বেশি ভাবিয়ে তোলে যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাবে ফেলে।কোয়ারেন্টাইনের সময়ে দীর্ঘ সময় বাইরে না যাওয়ার ফলে শিশুদের মধ্যে একঘেয়েমি ভাব,হতাশা,বিরক্তি প্রকাশ বৃদ্ধি পায়।এসময় পিতামাতার কড়া শাসন তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।এসময় শিশুদের মানসিক সুস্থতায় পিতামাতার করণীয়ঃ

  • শিশুদের আগ্রহের বিষয়গুলা নিয়ে কাজ করা যেমন-ছবি আঁকা,গান শিখানো,বিনোদনমূলক অনুষ্টান দেখার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা।
  • শিশুদের  সবসময় হাসিখুশি রাখার উদ্যোগ অভিভাবকদেরই নিতে হবে।
  • যেসব পিতামাতা পূর্বের দিনগুলোতে ব্যস্ততার জন্য সন্তানদের সময় দিতে পারে নাই,তারা যেন এখন শিশুদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো আনন্দময় করে রাখে।
  • তাছাড়া ইনডোর যেসব খেলাধুলা প্রচলিত যেমনঃলুডু,দাবা,ক্যারাম ইত্যাদি খেলেও  শিশুদের সাথে ভালো সময় কাটানো যায়।

বেশকিছু ভ্রান্ত ধারণা অনেকের মাঝেই দেখা যায় যেমন করোনা আক্রান্ত হলেই মৃত্যু অনিবার্য।৬ জুন প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে,আক্রান্তের বিচারে সুস্থতার হার প্রায় ২১.১৪ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার প্রায় ১.৩০ শতাংশ যা সুস্থতার বিচারে তুলনামূলকভাবে নগন্য।অতএব আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে মনোবল,ইচ্ছাশক্তি  দৃঢ় রেখে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে।করোনা পরিস্থিতিতে মানসিক সুস্থতায় প্রয়োজনীয় বিষয়াবলী নিম্নরূপঃ 

  • প্রিয় ব্যক্তিদের সুপরামর্শ নেওয়া। যাদের পরামর্শ মানসিকভাবে দৃঢ় রাখবে
  • খাদ্যভ্যাসে চারটি সহজলভ্য খাবারের সংযুক্তি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে।যেমনঃকোকোয়া,কাঠবাদাম,তৈলাক্ত মাছ,তুলসী পাতার চা প্রভৃতি।সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে।
  • শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা,সবার খোঁজ নেওয়া।
  • সবসময় করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত নিউজ না পড়ে বিনোদনমূলক নিউজে মনোনিবেশ করতে হবে।
  • নিজের উপর আস্থা রেখে আত্মপ্রত্যয়ী হতে হবে।
  • পছন্দের কাজগুলা যেমনঃবই পড়ে,গান শুনে,মুভি দেখে ভালো সময় কাটানো যেতে পারে।তবে শিক্ষার্থীরা Coursera,Udemy সহ বেশকিছু ওয়েবসাইট থেকে পছন্দের কোর্স করে নিজের স্কিল সমৃদ্ধ করতে পারে।
  • এছাড়াও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করা যেমনঃ ঠিক সময়ে ঘুমানো,খাবার খাওয়া,বাড়িতে হালকা ব্যায়াম করা প্রভৃতি।

উল্লেখিত বিষয়াবলী মেনে চললে মানসিক সুস্থতা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা যায়।

পরিশেষে,আমাদের মনে রাখতে হবে করোনাকালীন এই দূর্যোগ সাময়িক।আমাদের সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই মহামারী মোকাবিলা করা সম্ভব।এর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার ব্যক্তি সচেতনতা।এটিই করোনা মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সকলের সচেতনতা এবং নীতি- নির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপই পারে করোনাকালে এবং করোনা পরবর্তী সময়ে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে সুস্থ,সুন্দর,মানসিকভাবে চাপমুক্ত রাখতে।

Share this post

Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

Designed by Alamin Moni

Copyright© BASAT 2019-2020

error: Content is protected !!

লেখক পরিচিতি

MOHAMMED SAYDUL ISLAM Zahin

This is Mohammed Saydul Islam.I am pursuing my bachelor degree in department of Chemistry,University of Chittagong.I completed my schooling from Chittagong collegiate school and then got myself admitted into Chittagong College.My desire is to complete B.Sc. honours with good result and then accomplish higher study in abroad