Bangladesh Students' Association in Turkey BASAT

আয়া সোফিয়া মসজিদে পূন:রূপান্তর: পক্ষ বিপক্ষ সমালোচনা প্রসঙ্গেঁ!

আয়া সোফিয়া একটি নাম, একটি ইতিহাস, এবং একটি সভ্যতার পুনর্জাগরণ। তার্কিশ ভাষায় আয়া সোফিয়া, ইংরেজিতে হাগিয়া সোফিয়া, গ্রীকে আয়িয়া সোফিয়া এবং ল্যাটিন ভাষায় সাংক্তা সোফিয়া নামে ব্যবহার করা হয়। আবার কেউ কেউ হায়া সোফিয়া ও বলে থাকেন। যার অর্থ পবিত্র তথ্যাবলী।
এখানে নাম মুখ্য বিষয় না। ইতিহাসের পাতায় একটি প্রতিষ্ঠিত সভ্যতার স্মৃতি স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই আয়াসোফিয়া। যেটি বর্তমানে ইস্তাম্বুলের ফাতিহ পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত সুলতান আহমেদ জামের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে আছে। যার ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। কারো কাছে বিতর্কিত আবার কারো কাছে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে এই আয়া সোফিয়াকে মসজিদে পুনঃরূপান্তরের ঘোষণায় অনেক পক্ষ বিপক্ষ সমালোচনার ঝড় বইছে।

আমরা যদি একটু পেছনের ইতিহাসকে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো, এটি ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের নির্দেশে নির্মিত হয়। ১৪৫৩ সালে অটোমানদের হাত থেকে ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ নিজ অর্থায়নে আয়া সোফিয়াকে ক্রয় করে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। তখন থেকে এটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। সুতরাং এটি মুসলমানদের সম্পত্তি খ্রিস্টানদের নয়। যেহেতু ক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তির পরিবর্তন হয় সেখানে খ্রিস্টানদের সম্পত্তি বলে দাবি করা পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে কামাল আতাতুর্ক সরকার পশ্চিমা ক্রিস্টানদের গোলামির নমুনাস্বরুপ তাদের মনন জয়ের জন্য এটিকে মসজিদ থেকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করেন। যেটি ছিল অনেক বড় ধরনের অন্যায় ও মুসলিমদের সাথে গাদ্দারী। তারপর থেকে তুরস্কের জনগণ ও সমগ্র দুনিয়ার ধর্মপ্রাণ মুসলমানগন আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করার জন্য নিরব আন্দোলন করেন। অবশেষে বর্তমান সরকার প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সুদীর্ঘ 86 বছরের আন্দোলনের ফলস্বরূপ এটিকে পুনরায় মসজিদ রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই পুরো পৃথিবীতে পক্ষ বিপক্ষ সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে। কিছু আনাড়ি মুসলমানও এটাকে সঠিক নয় বলে পশ্চিমা খ্রিষ্টানদের সাথে সুর মিলাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করলে দেখা যায়, আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর কোন অন্যায় ও ভুল সিদ্ধান্ত নয়।

প্রথমত, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান কি অন্যায় ও ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন? না। কারণ তিনি আইনগত দিক ও নৈতিকতার দিক থেকে মুসলমানদের ক্রয় কৃত প্রপার্টি মুসলমানদের হাতে তাদের চাওয়া অনুযায়ী ফিরিয়ে দেন। ইতোপূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে, 1453 সালে সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ এই আয়া সোফিয়াকে অটোমান খ্রিস্টানদের হাত থেকে নিজ অর্থায়নে ক্রয় করে মুসলমানদেরকে ওয়াকফ করে দেন। যা অন্যায় কোন কাজ নয়। যার ডকুমেন্টস আজও বিদ্যমান। কিন্তু পশ্চিমা ইতিহাসের সুরে অনেক মুসলিম নামধারী ঐতিহাসিক এটিকে জোর করে দখল করার প্রশ্ন উত্থাপন করেন, যেটি আসলে অবান্তর ও মিথ্যা।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপসহ খ্রিস্টান ও ইহুদী গোষ্ঠী কখনো মুসলমানদের তথা ইসলামের উন্নয়নে সহযোগিতা করে না বরং মুসলিম দেশগুলোতে স্থায়ী অশান্তি ও ধ্বংসযজ্ঞ চলমান রাখে। যা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তদ্রুপ, আয়া সোফিয়া, বাইতুল মুকাদ্দাস ও বসফরাস প্রণালী সহ প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মুসলমানদের সাথে দীর্ঘ শত্রুতার সম্পর্ক বজায় রাখছে। যা স্পষ্টত, বড় ধরনের গাদ্দারী ও বিরোধিতা। অপরদিকে, তুরস্কের অর্থনীতিতে অন্যায়ভাবে সুদীর্ঘ ভঙ্গুরের আক্রোশ পৃথিবীর ইতিহাস কখনো ভুলবে না। যা আদৌ চলমান। সুতরাং, এই আয়াসোফিয়া জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তরিত করন খ্রিস্টান ও ইহুদী সম্প্রদায়সহ পশ্চিমা বিশ্বের সকল মোড়লদেরকে মুসলিম শাসক এরদোয়ানের চপেটাঘাত নয় কি! সুতরাং, আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিতকরন মুসলমানদের প্রথম বিজয়ের ধাপ এবং বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদি মুক্তকরনের ভবিষ্যৎ নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা বলা যায়।

তৃতীয়ত, আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করন সিদ্ধান্ত তুরস্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরদোয়ান সরকারের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান ও সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম ও জনগণের হৃদয়ে প্রশান্তির বাতিঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয়ে সুদীর্ঘ 86 বছরের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। যা সকলের হৃদয় উল্লাসিত আনন্দের ও শুকরিয়া জ্ঞাপনের মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়। কেননা এটি তুরস্কের মুসলমানদের জনপ্রিয় অভিভাবক ও নেতা প্রফেসর নাজিম উদ্দিন এরবাকান এবং বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির দীর্ঘ স্বপ্ন ও চেষ্টা ছিল। তারা তাদের জীবদ্দশায় আয়া সোফিয়াকে মসজিদ থেকে জাদুঘরের অন্যায় সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেননি। আর এইজন্যই এরদোয়ান সরকার তুরস্কের মুসলমানদেরকে এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আয়াসোফিয়াকে মসজিদে পুনরায় রূপান্তরিত করার মাধ্যমে তাদের হৃদয় জায়গা করে নেন। এটাই এরদোয়ান সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী মুসলিমদের ভবিষ্যৎ শাসক হওয়ার সুযোগ দিবে বলে মনে করি।

চতুর্থত, আয়াসোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করন মুসলমানদেরকে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের এবং হিন্দুদের দখলদারিত্বে থাকা বাবরি মসজিদসহ ইউরোপের দেশগুলোতে মুসলমানদের মসজিদ, কমপ্লেক্স, লাইব্রেরী ও স্থাপনাসমূহের রক্তক্ষরণের জবাব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠিন হুংকার বলা যায়। যা পরবর্তীতে পৃথিবীর মুসলমানদেরকে ইহুদি খ্রিস্টান ও হিন্দু বৌদ্ধদের অধ্যুষিত দেশসমূহে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাবে। এবং সকল জুলুমের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য প্রতিবাদের সাক্ষী হয়ে রইল এই আয়া সোফিয়া জামে।

পঞ্চমত, 2023 সালে শেষ হচ্ছে লুজান চুক্তি। যে চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলো বসফরাস প্রণালী কে গত একশত বছর ধরে ফ্রী ব্যবহার করছে। যেখানে তুরস্ক তাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের একটি রেমিটেন্স থেকে বঞ্চিত। কেননা, ইউরোপের দেশগুলোর সমুদ্রপথে সকল জাহাজ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ফ্রি ভাবে এ প্রণালী দিয়ে পার হয়। 2023 এ এই চুক্তি শেষে তুরস্ক ইউরোপের দেশ গুলোর উপরে একক কর্তৃত্ব ও পরাশক্তি হিসেবে পরিগণিত হবে কেননা তখন তুরস্ক সরকার বসফরাস প্রণালীর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে পাবে। আর এটাই ইউরোপ দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ভয়। যার জন্য তারা তুরস্কে কখনো শক্তিশালী শাসককে সহ্য করতে পারে না। এজন্যই এরদোয়ান সরকারকে হটানোর জন্য তাদের সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে। বস্তুত, এরদোয়ান সরকার আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করণের মাধ্যমে ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের সকল ক্ষমতাবান মোড়লদেরকে বুড়ো আঙ্গুল ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়েছেন। আর এটাই লুজান চুক্তির পরিসমাপ্তির দিনে বসফরাসের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অনুপ্রেরণা যোগাবে বলে মনে করছি। এবং এটাই হতে পারে তুরস্কের একক পরাশক্তি ও শক্তিশালী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করার মাইলফলক।

ষষ্ঠত, অনেকেই ধারণা করেন এই আয়াসোফিয়া খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উপসনালয়। আসলে এটা ভুল ধারণা। কেননা উপাসনালয় হিসেবে অটোমান শাসন ব্যবস্থা থাকাকালীন ব্যবহৃত হতো। কিন্তু পরবর্তীতে সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ এই আয়াসোফিয়াকে ক্রয় করার মাধ্যমে মুসলমানদের স্থায়ী প্রপার্টিতে রূপান্তরিত হয় এবং যা মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধুমাত্র মধ্যখানে কামাল আতাতুর্কের হঠকারী সিদ্ধান্ত আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে 86 বছর জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এরদোয়ান সরকার কেবল আইন পরিবর্তন করে মসজিদ বানান। সুতরাং খ্রিস্টান সম্প্রদায় কখনো এই আয়াসোফিয়াকে তাদের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করতে পারে না। ধর্মীয় দিক থেকেও এই আয়া সোফিয়া মুসলমানদের একক সম্পত্তি যা মসজিদ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।

পরিশেষে, উপরোল্লেখিত প্রত্যেকটি বিশ্লেষণেই প্রমাণ করে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের আয়াসোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত কোন অন্যায় ও ভুল সিদ্ধান্ত নয়। যা শুধুমাত্র অন্যায় ও জুলুমের প্রতিবাদ। আর এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সকল মুসলমানদের হৃদয়ে গভীর অনুপ্রেরণার জায়গা দখল করে নিয়েছেন। আর এই প্রতিবাদ প্রত্যেকটি জুলুম ও অন্যায়ের ভবিষ্যৎ অনুপ্রেরণা হবে বলে বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং আমরা যারা বুঝে না বুঝে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সুর তুলছি আসলে আমরা বোকার স্বর্গে বসবাস করছি না হয় পশ্চিমাদের গোলামী ও দালালি করছি। আমাদের মনে রাখা দরকার হিংস্র প্রাণী কখনো কারো বন্ধু হতে পারে না। তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের ইহুদি ও ক্রিস্টান অধ্যুষিত দেশগুলোও কখনো মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না। আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার এবং সচেতন হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।।

Share this post

Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

Designed by Alamin Moni

Copyright© BASAT 2019-2020

error: Content is protected !!

লেখক পরিচিতি

মু. সালাহ উদ্দিন

মু. সালাহ উদ্দিন বাংলাদেশের ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া নিজ এলাকায় চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া থেকে আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিস বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর স্তরসমূহ কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন।

২০১৬ সালে তুরস্ক সরকারের বৃত্তি নিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভের উদ্দেশ্যে ইস্তান্বুলে আসেন। তুরস্কে আন্তর্জাতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর তীর্থকেন্দ্র UDEF’এ এশীয় সমন্বয়ক (Asian Coordinator) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে তিনি ইস্তান্বুলের মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী দর্শন বিষয়ে ডক্টরেট গবেষণারত। পাশাপাশি, তুরস্কের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সংগঠন Econo mic and Business organization (ETD) এর ফরেন কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত এবং ‘‘আল-কোরআন একাডেমি লন্ডন’’ এর তুরস্ক সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্বরত। এছাড়াও তিনি Bangladesh Student Association in Turkey (BASAT) এর এক্সিকিউটিভ সদস্য ও বাংলাদেশের যুবসংগঠন ‘‘Runner Bangladesh Development Society’’ এর সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা ও সৃজনশীল জ্ঞান বিকাশের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ প্রত্যাশা করেন। দেশে-বিদেশে গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।